বুধবার, ১৮ ডিসেম্বর, ২০২৪

কংগ্রেসের "প্রো-ব্রিটিশ" হওয়ার অভিযোগ: একটি ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিত

ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস (INC)কে প্রায়ই "প্রো-ব্রিটিশ" হওয়ার অভিযোগের সম্মুখীন হতে হয়েছে, বিশেষত যখন দলের নেতা বা সদস্যরা ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে আলোচনা বা সমঝোতা করেছিলেন। এই অভিযোগটি বিশেষভাবে কংগ্রেসের প্রথম দিনগুলিতে এবং ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের কিছু গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে উঠেছিল, যখন দলটি সরাসরি ব্রিটিশ শাসনের বিরোধিতা না করে বরং কিছু সংস্কারের জন্য বা সহযোগিতার জন্য ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে সমঝোতা করতে চাইছিল। যদিও কংগ্রেসের আসল লক্ষ্য ছিল ভারতীয়দের অধিকারের সুরক্ষা এবং স্বাধীনতা অর্জন, তবুও কিছু সময়ে ব্রিটিশ সরকারের সাথে সহযোগিতার কারণে কংগ্রেসকে এই ধরনের অভিযোগের সম্মুখীন হতে হয়েছিল। আসুন জানি কেন কংগ্রেসকে এই অভিযোগের মুখোমুখি হতে হয়েছিল এবং সময়ের সাথে সাথে এই অভিযোগগুলি কিভাবে পরিবর্তিত হয়েছে।

১. কংগ্রেসের প্রাথমিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে সহযোগিতা

ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৮৫ সালে, এবং এর প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মধ্যে ভারতীয়দের জন্য রাজনৈতিক সংস্কার এবং অধিকারের দাবী করা। কংগ্রেসের প্রথম দিকের নেতারা যেমন এ.ও. হিউম এবং দাদাভাই নওরোজি মনে করতেন যে, যদি তারা ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে সহযোগিতা করে, তাহলে ভারতীয়রা ধীরে ধীরে আরও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব এবং স্বায়ত্তশাসন পেতে পারে।

প্রথমদিকে কংগ্রেসের নেতারা সংলাপ এবং সংস্কারের জন্য পন্থা অবলম্বন করেছিলেন, বিশ্বাস করতেন যে ব্রিটিশদের সঙ্গে কাজ করলে ভারতকে আরও বেশি স্বশাসন দেওয়া হতে পারে। এই সময়ে কংগ্রেসের উদ্দেশ্য ছিল ভারতের মধ্যে অধিকার এবং অংশগ্রহণের অধিকার পাওয়া, পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি না করা। তাই, সেই সময়ে কংগ্রেসকে "প্রো-ব্রিটিশ" হিসেবে দেখা হত, কারণ তারা সরাসরি ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করছিল না, বরং তাদের শাসন ব্যবস্থার মধ্যে সংস্কারের জন্য কাজ করছিল।

২. সমঝোতা এবং সমালোচনা

কংগ্রেসের "প্রো-ব্রিটিশ" হওয়ার অভিযোগ প্রধানত তখনই ওঠে, যখন দলটি ব্রিটিশ সরকারের সাথে সমঝোতা বা চুক্তি করেছিল, অথবা ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে পূর্ণ রুখে দাঁড়ানোর পরিবর্তে কিছু সংস্কারের জন্য বোঝাপড়া করতে চেয়েছিল। এর কিছু প্রধান উদাহরণ হল:

  • গাঁধী-ইরভিন চুক্তি (১৯৩১): এই চুক্তি ছিল মহাত্মা গাঁধী এবং ব্রিটিশ ভাইসরয় লর্ড ইরভিন এর মধ্যে, যেখানে গাঁধীজি কিছু সংস্কারের জন্য সম্মতি দেন এবং কিছু রাজনৈতিক বন্দীকে মুক্ত করার শর্তে নমক আন্দোলন এবং অন্যান্য প্রতিবাদ স্থগিত করেন। যদিও এই চুক্তি ভারতীয়দের জন্য কিছু রাজনৈতিক স্বাধীনতা আনতে সাহায্য করেছিল, কিন্তু এতে কংগ্রেসকে "প্রো-ব্রিটিশ" বলে সমালোচিত করা হয়েছিল, কারণ এতে স্বাধীনতা দাবি করা হয়নি এবং ব্রিটিশ শাসনের সঙ্গে এক ধরনের সমঝোতা করা হয়েছিল।

  • ভারত সরকার আইন, ১৯৩৫: এই আইনটি ব্রিটিশ সরকার দ্বারা পাশ করা হয়েছিল, যা ভারতের কিছু অটোনমি বা স্বায়ত্তশাসন প্রদান করেছিল, কিন্তু ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছিল। কংগ্রেস, এই আইনের সীমিত সংস্কারের প্রতি আপত্তি জানালেও, রাজ্যভিত্তিক নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিল। কিছু সমালোচক মনে করতেন, এটি ব্রিটিশ শাসন মেনে নেওয়া এবং কংগ্রেসের "প্রো-ব্রিটিশ" চিত্রকে শক্তিশালী করেছিল।

৩. মহাত্মা গাঁধী এবং সরাসরি প্রতিরোধের দিকে অগ্রসর হওয়া

মহাত্মা গাঁধী এর নেতৃত্বে, কংগ্রেসের দৃষ্টিভঙ্গি ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়। গাঁধীজি কংগ্রেসকে সরাসরি ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করার দিকে নিয়ে আসেন। গাঁধীজির আন্দোলনগুলি, যেমন নমক সত্যাগ্রহ (১৯৩০) এবং ভারত ছাড়ো আন্দোলন (১৯৪২), ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ছিল।

  • নমক সত্যাগ্রহ ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছিল, বিশেষত সল্ট ট্যাক্সের বিরুদ্ধে, এবং এটি অহিংস প্রতিরোধের একটি প্রতীক হয়ে ওঠে।
  • ভারত ছাড়ো আন্দোলন (১৯৪২), গাঁধীজির নেতৃত্বে, ব্রিটিশ শাসন ত্যাগের জন্য একটি তাত্ক্ষণিক আহ্বান ছিল। এই আন্দোলন কংগ্রেসের বিরুদ্ধে সরাসরি প্রতিরোধের প্রবাহ সৃষ্টি করে এবং কংগ্রেসকে "প্রো-ব্রিটিশ" হওয়ার অভিযোগ থেকে মুক্ত করে, কারণ এখন কংগ্রেস পরিষ্কারভাবে ব্রিটিশ শাসনের বিরোধিতা করছিল।

৪. স্বাধীনতার পর কংগ্রেসের দৃষ্টিভঙ্গি

"প্রো-ব্রিটিশ" হওয়ার অভিযোগ কংগ্রেসের প্রতি তখনও উঠছিল যখন দলটি কিছু সমঝোতা বা চুক্তি করেছিল, তবে ১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতার পর এটি স্পষ্ট হয়ে যায় যে কংগ্রেসের আসল লক্ষ্য ছিল ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্তি লাভ। কংগ্রেসের প্রাথমিক সহযোগিতা ছিল একটি কৌশলগত পদক্ষেপ, যা ভারতীয়দের জন্য কিছু রাজনৈতিক অধিকারের দাবি করা ছিল। তবে স্বাধীনতার সংগ্রামের সাথে সাথে কংগ্রেস সরাসরি প্রতিরোধের দিকে চলে আসে এবং তার সমস্ত প্রচেষ্টা ভারতের স্বাধীনতার দিকে নিবদ্ধ হয়।

উপসংহার

কংগ্রেসের "প্রো-ব্রিটিশ" হওয়ার অভিযোগ কিছু সময়ের জন্য সঠিক হতে পারে, বিশেষত যখন দলটি সংস্কারের জন্য ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে সহযোগিতা করেছিল। তবে কংগ্রেসের মূল লক্ষ্য ছিল ভারতীয়দের অধিকার রক্ষা করা এবং স্বাধীনতা অর্জন করা। সময়ের সাথে সাথে, বিশেষত গাঁধীজির নেতৃত্বে, কংগ্রেস ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সরাসরি প্রতিরোধের পথে এগিয়ে যায় এবং ভারতকে স্বাধীনতা লাভের জন্য দৃঢ় সংগ্রাম চালায়। সুতরাং, কংগ্রেসের "প্রো-ব্রিটিশ" হওয়ার অভিযোগ একটি নির্দিষ্ট সময়ে সঠিক হলেও, এটি ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের শেষের দিকে পুরোপুরি দুর্বল হয়ে পড়ে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

স্বামিত্ব যোজনা: গ্রামীণ ভারতের সম্পত্তি অধিকার ও উন্নয়নের নতুন দিগন্ত

স্বামিত্ব যোজনাঃ গ্রামীণ ভারতের সম্পত্তি অধিকার প্রদান ভারত সরকার ২০২০ সালে স্বামিত্ব যোজনা (Swamitva Yojana) নামে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্...